একজন স্বপ্নবাজ আব্দুল কালাম এবং একজন মমতাময়ী মায়ের হৃদয় স্পর্শী গল্প

0
1458
জন পড়েছেন
এপিজে আব্দুল কালামের মর্মস্পর্শী গল্প, এপিজে আব্দুল কামাল এবং তার মায়ের গল্প

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও পুরমানু বিজ্ঞানী ডঃ এ পি জে আব্দুল কালামের ছোটবেলা কেটেছে প্রচণ্ড কষ্ট করে । তাঁর বাবা জয়নুল-আবেদিন একজন নৌকার মাঝি এবং মা আশিয়াম্মা একজন গৃহবধূ ছিলেন। খুব গরীব পরিবারের সন্তান আব্দুল কালাম । পরিবারের দারিদ্র্যতা তার পড়াশুনার পথে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল । তাই খুব অল্প বয়সেই তাকে জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশায় কাজ করতে হয়েছিল। বিদ্যালয়ে ছুটির পর তিনি সংবাদপত্র বিক্রি করে রোজগার করতেন। তাঁর পুরো নাম আবুল পাকির জয়িনুল-আবেদিন আব্দুল কালাম । 
প্রচণ্ড স্বপ্নবাজ মানুষ ছিলেন এ পি জে আবদুল কালাম । ভালোবাসতেন স্বপ্ন দেখতে, আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি নিয়ে ছুটে চলতেন সেই স্বপ্নের পিছুপিছু । এভাবেই এগিয়ে যেতেন তিনি । স্বপ্ন শুধু নিজে দেখেই থেমে যেতেন না, সেই স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিতেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে । এমনকি মৃত্যুর কিছুক্ষন আগেও সেই স্বপ্নের কথাই বলছিলেন একঝাক শিক্ষার্থীদের সাথে । তারপর ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে ।

apj abdul kalam

You have to dream before your dreams can come true.

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও খ্যাতিমান এই পরমাণুবিজ্ঞানী সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন শিক্ষার্থীদের সাথে সময় কাটাতে । তাদের মনে আলো জ্বালাতে চাইতেন তিনি । জীবনে অনেক চড়াই উৎরাই পার করতে হয়েছে তাকে । তাই জীবন থেকে পেয়েছেন অনেক শিক্ষা । পাই ফিঙ্গার্স মোটিভেশনের পক্ষ থেকে তেমনি তার নিজের জীবন থেকে নেওয়া একটি গল্প থাকছে আর আপনাদের জন্য ।

তখন ১৯৪১ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। আমরা থাকতাম রামেশ্বরম শহরে। এখানে আমাদের পরিবার বেশ কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে সময় পার করছিল। আমার বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। কলম্বোতে যুদ্ধের দামামা বাজছে, আমাদের রামেশ্বরমেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। খাবার থেকে শুরু করে নিত্যব্যবহার্য পণ্য, সবকিছুরই দারুণ সংকট। আমাদের সংসারে পাঁচ ভাই, পাঁচ বোন। তাদের মধ্যে তিনজনের আবার নিজেদেরও পরিবার আছে, সব মিলিয়ে এক এলাহি কাণ্ড। আমার দাদি ও মা মিলে সুখে-দুঃখে এই বিশাল সংসার সামলে রাখতেন।

apj abdul kalam

আমি প্রতিদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে অঙ্ক শিক্ষকের কাছে যেতাম। বছরে মাত্র পাঁচজন ছাত্রকে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতেন। আমার মা আশিয়াম্মা ঘুম থেকে উঠতেন আমারও আগে। তিনি আমাকে গোসল করিয়ে, তৈরি করে তারপর পড়তে পাঠাতেন। পড়া শেষে সাড়ে পাঁচটার দিকে বাড়ি ফিরতাম। তারপর তিন কিলোমিটার দূরের রেলস্টেশনে যেতাম খবরের কাগজ আনতে। যুদ্ধের সময় বলে স্টেশনে ট্রেন থামত না, চলন্ত ট্রেন থেকে খবরের কাগজের বান্ডিল ছুড়ে ফেলা হত প্ল্যাটফর্মে। আমার কাজ ছিল সেই ছুড়ে দেওয়া কাগজের বান্ডিল সারা শহরে ফেরি করা, সবার আগে গ্রাহকের হাতে কাগজ পৌঁছে দেওয়া।

 

কাগজ বিক্রি শেষে সকাল আটটায় ঘরে ফিরলে মা নাশতা খেতে দিতেন। অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই দিতেন, কারণ আমি একই সঙ্গে পড়া আর কাজ করতাম। সন্ধ্যাবেলা স্কুল শেষ করে আবার শহরে যেতাম লোকজনের কাছ থেকে বকেয়া আদায় করতে। সেই বয়সে আমার দিন কাটত শহরময় হেঁটে, দৌড়ে আর পড়াশোনা করে। একদিন সব ভাইবোন মিলে খাওয়ার সময় মা আমাকে রুটি তুলে দিচ্ছিলেন, আমিও একটা একটা করে খেয়ে যাচ্ছিলাম (যদিও ভাত আমাদের প্রধান খাবার, কিন্তু রেশনে পাওয়া যেত গমের আটা)।

‘কালাম, কী হচ্ছে এসব? তুমি খেয়েই চলছিলে, মাও তোমাকে তুলে দিচ্ছিল। তার নিজের জন্য রাখা সব কটি রুটিও তোমাকে তুলে দিয়েছে। এখন অভাবের সময়, একটু দায়িত্বশীল হতে শেখো। মাকে উপোস করিয়ে রেখো না।’

খাওয়া শেষে বড় ভাই আমাকে আলাদা করে ডেকে বললেন, ‘কালাম, কী হচ্ছে এসব? তুমি খেয়েই চলছিলে, মাও তোমাকে তুলে দিচ্ছিল। তার নিজের জন্য রাখা সব কটি রুটিও তোমাকে তুলে দিয়েছে। এখন অভাবের সময়, একটু দায়িত্বশীল হতে শেখো। মাকে উপোস করিয়ে রেখো না।’ শুনে আমার শিরদাঁড়া পর্যন্ত শিউরে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কাছে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম।

মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়লেও পরিবারে ছোট ছেলে হিসেবে আমার একটা বিশেষ স্থান ছিল। আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। কেরোসিন দিয়ে বাতি জ্বালানো হতো; তাও শুধু সন্ধ্যা সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত। মা আমাকে কেরোসিনের ছোট্ট একটা বাতি দিয়েছিলেন, যাতে আমি অন্তত রাত ১১টা পর্যন্ত পড়তে পারি। আমার চোখে এখনো পূর্ণিমার আলোয় মায়ের মুখ ভাসে।

apj abdul kalam

আমার মা ৯৩ বছর বেঁচে ছিলেন। ভালোবাসা আর দয়ার এক স্বর্গীয় প্রতিমূর্তি ছিলেন আমার মা।
মা, এখনো সেদিনের কথা মনে পড়ে, যখন আমার বয়স মোটে ১০। সব ভাইবোনের ঈর্ষাভরা চোখের  তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতাম। সেই রাত ছিল পূর্ণিমার। আমার পৃথিবী শুধু তোমাকে জানত মা! আমার মা! এখনো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠি। চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। তুমি জানতে ছেলের কষ্ট । তোমার আদরমাখা হাত আমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিত। তোমার ভালোবাসা, তোমার স্নেহ, তোমার বিশ্বাস আমাকে শক্তি দিয়েছিল মা।  সৃষ্টিকর্তার শক্তিতে ভয়কে জয় করতে শিখিয়েছিল।

 

তার দুঃসময়ের আরেকটি হৃদয়স্পর্শী গল্প জানতে ক্লিক করুন এখানে…  

 

আগামী পর্বে আপনি কাকে দেখতে চান   তা কমেন্ট করে জানান । সফলতা কেবল আপনার জন্যই।

Facebook Comments
SHARE