আব্রাহাম লিংকন | কাঠুরে থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠা

1
4128
জন পড়েছেন
আব্রাহাম লিংকনের সংগ্রাম, কাঠুরে থেকে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন

আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার ১৬ তম রাষ্ট্রপতি । তিনি দুইবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হল । আব্রাহাম লিংকন কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও ছিলেন অসাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন এক মহান ব্যক্তি।

তার প্রমাণ মেলে তাঁর অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর রাখা বিভিন্ন ক্ষেত্রে। আজকে থাকছে এক দরিদ্র ছেলে আব্রাহাম লিংকনের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার গল্প ।

তিনি ১৮০৯ সালের ১২-ই ফেব্রুয়ারি আমেরিকার কেনটাকি রাজ্যের হার্ডিন কাউন্টিতে অতি সাধারণ একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ।

জ্ঞান অন্বেষণে লিংকন ছিলেন একজন মনযোগী পাঠক।

 

বাবার নাম থমাস লিংকন আর মায়ের নাম ন্যান্সী হ্যাঙ্কস লিংকন । মাত্র ৯ বছর বয়সে আব্রাহাম মাকে হারান ।  

এর কয়েক মাস পর বাবা সারাহ বুশ জন্সটন নামে একজন  বিধবা মহিলাকে বিয়ে করেন, যার আগের পক্ষেরও তিনটি সন্তান ছিল ।  

সারাহ বুশ জন্সটন সৎ মা হলেও তিনি খুব ভালোবাসতেন আব্রাহামকে । তার পড়াশুনার জন্যও বেশ উৎসাহ দিতেন তিনি । ছোটবেলা থেকে বই পড়ার প্রতি ভীষণ রকমের আগ্রহ ছিল আব্রাহাম লিংকনের ।

জ্ঞান অন্বেষণে লিংকন ছিলেন একজন মনযোগী পাঠক

 

আব্রাহাম লিংকনের জীবনী

কিন্তু লিংকন সর্বসাকুল্যে মাত্র ১৮ মাস প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করেন । লিংকন একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তি । বই পড়ার জন্য তিনি মাইলের পর মাইল পথ হেটে বই সংগ্রহ করেছেন ।

তিনি পারিবারিক বাইবেল এবং তখনকার বিখ্যাত বইসমূহ যেমন- রবিনসন ক্রুসো, তীর্থযাত্রীদের অগ্রগতি ও ইশপের গল্প পড়তে খুবই পছন্দ করতেন ।

জ্ঞান অন্বেষণে লিংকন ছিলেন একজন মনযোগী পাঠক।

 

খুব ছোট বেলা থেকেই লিংকন তার দরিদ্র বাবার পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন । তিনি নৌকা চালিয়ে পরিবারের জন্য রোজগার করতেন । কাঠ কাটার কাজও করেছিলেন ।

আব্রাহাম লিংকনের জীবনী
আব্রাহাম লিংকন

১৭ বছর বয়সে তার এক বন্ধুকে নিয়ে তিনি একটি দোকান কিনে ব্যবসা শুরু করেন । ব্যবসাটি ভাল চলছিল না বলে তিনি তার নিজের অংশের শেয়ারটুকু বিক্রি করে দেন ।

কিন্তু হঠাৎ তার বন্ধুর মৃত্যু হলে বন্ধু করা এক হাজার ডলারের ঋণের দায় এসে পড়ে তার উপর । ১৭ বছর ধরে তিনি এই ঋণ পরিশোধ করেন ।  

 

লিংকন পোস্টমাস্টার হিসেবেও কাজ করেছিলেন কিছুদিন

 

আব্রাহাম লিংকনের জীবনী
আব্রাহাম লিংকন

ব্লাক হ্যাক যুদ্ধের পর আব্রাহাম লিঙ্কন তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন । ১৮৩৪ সালে ইলিনয়ে Whig Party-র রাজ্য আইনসভার একজন সদস্য নির্বাচিত হন তিনি ।

এই সময়ে তিনি একজন আইনজীবী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং William Blackstone এর Commentaries on the Laws of England’ বই নিজে নিজে পড়া শুরু করেন । তারপর আইনের চর্চা করতে থাকেন তিনি ।

 

 

এরপর তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ।

তিনি নিউ সালেমে ইলিনয়েস জেনারেল এসেম্বলি নির্বাচনে উইগ পার্টির পক্ষে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি পার্টির মনোনয়ন পান এবং আইন সভায় উইগ পার্টির হয়ে নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক সফলতার ক্ষেত্রে তাকে কখনও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

তিনি ১৮৪৭-১৮৪৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে লিংকন সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দিয়ে স্টিফেন ডগলাসের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন। এই সময় ‘লিংকন-ডগলাস বিতর্ক’ এবং ক্রীতদাস প্রথা সংক্রান্ত কানসাস-নেব্রাস্কা আইনের উপর বিতর্ক, অল্প সময়ের মধ্যেই লিংকনকে জাতীয় পর্যায়ে সুখ্যাতি এনে দেয় ।

 

আব্রাহাম লিংকনের জীবনী
আব্রাহাম লিংকন

ছেলের শিক্ষকের কাছে আব্রাহাম লিংকনের চিঠি

 

১৮৬০ সালে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার ১৬ তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন । আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ১৫ এপ্রিল ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। লিংকন ছিলেন মিষ্টভাষী এবং বিনয়ী। জনতাকে আকৃষ্ট করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তিনিই ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির প্রথম রাষ্ট্রপতি । ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন ।

তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দাস প্রথার অবসান ঘটান । ১৮৬৩ সালে মুক্তি ঘোষণার মাধ্যমে তিনি দাসদের মুক্ত করে দেন । এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংগঠিত মার্কিন গৃহযুদ্ধে তিনি ইউনিয়ন বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে দক্ষিণের কনফেডারেট জোটকে পরাজিত করেন । এতে ৩৫ লাখ ক্রীতদাস মুক্ত হয় । গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৮৬৩-এর নভেম্বর মাসে পেনসালভেনিয়া অঙ্গ রাজ্যের গেটিসবার্গে লিংকন একটি ভাষণ দেন ।

 

আব্রাহাম লিংকনের জীবনী

 

এই ভাষণই ইতিহাসে বিখ্যাত গেটিসবার্গ ভাষণ হিসেবে পরিচিত । এটিই পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম সেরা ভাষণ হিসেবে এখনও বিশ্বব্যাপী পরিচিত ।

লিংকন গণতন্ত্রের সংজ্ঞার অন্যতম প্রবক্তা। তার দেওয়া গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও নীতি আজও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও সর্বজন গৃহীত। গণতন্ত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, “The government is the people, for the people, by the people, shall not perish from the earth.” অর্থাৎ “সরকার হলো জনগণ, জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, যা  কখনোই ধ্বংস হবে না”।

আব্রাহাম লিংকনের জীবনী
আব্রাহাম লিংকন

আমেরিকার অখণ্ডতা বজায় রাখা,গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে লিংকন এখনও আমেরিকার আদর্শ হয়ে আছেন যা আমেরিকার মানুষের কাছে তথা বিশ্বব্যাপী মানুষ চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

লিংকন ১৮৬৪ সালে পুনরায় আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। লিংকন ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল উইলকেস বুথ নামের এক আততায়ীর গুলিতে আহত হয়ে পরের দিন নিহত হন ।

কেন তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিলেন??

 

আমরা কারো শত্রু নই, আমরা সবাই বন্ধু

 

  • আব্রাহাম লিংকন একজন সাধারণ রাজনীতিবিদ থেকে আমেরিকার সেরা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন । তিনি নিজেকে আমেরিকানদের স্বার্থে বিলিয়ে দিয়েছেন । আর এ কারণেই তিনি সবার চোখে মহান হতে পেরেছেন ।

 

  • রাষ্ট্রপতি লিংকন আবেগপ্রবণ কোন রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি প্রতিপক্ষের ঢালাওভাবে সমালোচনা করতেন না। তিনি শত্রু সহ অন্যদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং প্রতিকূল পরিবেশে তিনি তার এই শক্তিকেই কাজে লাগাতেন।
  • আব্রাহাম লিংকনের জীবনী
    আব্রাহাম লিংকন

 

  • একবার তার ভাষণে তিনি বলেন, “আমরা কারো শত্রু নই, আমরা সবাই বন্ধু। আন্তরিকতায় ব্যাঘাত ঘটলেও তা যেন সম্পর্কের বন্ধনকে ছিন্ন না করে।”

 

  • আব্রাহাম লিংকন কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও ছিলেন অসাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন এক মহান ব্যক্তি। তার প্রমাণ মেলে তাঁর অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর রাখা বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তিনি তাঁর সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বরাবর একটি চিঠি লিখেছিলেন যা আজও শিক্ষকদের জন্য শিক্ষাদানের পথ-নির্দেশিকা হিসেবে প্রচলিত । 

আব্রাহাম লিংকন একজন সাধারণ রাজনীতিবিদ থেকে আমেরিকার সেরা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন

 

আপনার আশে পাশে যদি এমন কোন মানুষ থাকে যার এই লেখাটি পড়া উচিত বলে মনে করেন , তার সাথে অবশ্যই শেয়ার করবেন । অনুপ্রেরণামূলক গল্প, সফল ব্যক্তিদের জীবনী, সফলতার সূত্র এবং জীবনের নানান সমস্যা আপনাদের পাশে আছে পাই ফিঙ্গার্স মোটিভেশন ।

সফলতা কেবল আপনার জন্যই ।

Facebook Comments
SHARE